দুই মাস ক্রমাগত কত পথ চলতে চলতে পুরাণপ্রসিদ্ধ মাহিষ্মতী নগর পার হয়ে উপস্থিত হন ওঙ্কারনাথের দ্বীপশৈলে।এই ওঙ্কারনাথ পাহাড়টি নর্মদার
স্রোতধারাকে দুভাগে বিভক্ত করে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। পুরাণে এই পাহাড়কেই বলা হয়েছে বৈদুর্যমণি পর্বত। পুরাকালে একসময় ভক্তবীর মান্ধাতার রাজধানী ছিল এই পাহাড়ে। ওঙ্কারনাথ, মহাকাল প্রভৃতি জাগ্রত লিঙ্গগুলি যুগ যুগ ধরে বিরাজ করছে এই পাহাড়ের কোলে। আজও ভারতের দূর-দূরান্ত হতে অগণিত তীর্থ-যাত্রীর সমাগম হয় এই সব জাগ্রত শিবলিঙ্গ দর্শনের জন্য।
এই ওঙ্কারনাথ পাহাড়ে এসে হঠাৎ জঙ্গলে ঢাকা এক সংকীর্ণ গুহার মুখ দেখতে পেলেন শঙ্কর। গুহার মুখে প্রবেশ করে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। দেখলেন, ভিতরে এক প্রশস্থ সুড়ঙ্গপথ সামনে প্রসারিত হয়ে আছে। কয়েকজন জটাজুটধারী প্রবীণ সন্ন্যাসী ধ্যানস্থ হয়ে আছেন। গুহাটি একেবারে অন্ধকার নয়। বাইরে থেকে আসা স্বল্প আলোয় মোটের উপর ভিতরটা দেখা যায়।
যে কয়েকজন সন্ন্যাসী ধ্যান করছিলেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ তপস্বীর কাছে গিয়ে শঙ্কর সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে তাঁকে বললেন, প্রভু, আমায় ক্ষমা করবেন। আমি মহাযোগী গোবিন্দপাদের দর্শনাভিলাসী। তিনি তাঁর করুণা চাই। বহুদূর থেকে এই অভিলাষ নিয়ে এসেছি। কৃপা করে তাঁর সন্ধান বলে দিয়ে আমার প্রাণ রক্ষা করুন। কিছুক্ষণ পরে মৌন সাধক চক্ষু উন্মীলন করে তাকালেন শঙ্করের মুখপানে। দেখলেন, এক বালক নতজানু হয়ে বারবার সেই একই প্রার্থনা করছে কাতরভাবে। তার চোখ দিয়ে সমানে বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অবিরল জলের ধারা। বালকের এই সকাতর প্রার্থনায় বিচলিত হলো সাধকের অন্তর। তিনি হাত তুলে অভয় দিলেন শঙ্করকে। পাথরে পাথরে ঘষে আগুন জ্বেলে সেই আগুনে প্রদীপ জ্বালালেন সাধক। তারপর সেই প্রদীপটি হাতে তুলে দিয়ে বললেন, আমাকে অনুসরণ করো।
সেই গিরিগুহার শেষপ্রান্তে একটি গর্ভগুহা ছিল। সেই গর্ভগুহার মুখটি একটি বড় পাথর দিয়ে বন্ধ করা ছিল। সেখানে গিয়ে থামলেন প্রবীণ সাধক। বললেন, এই গুহার মধ্যেই মহাযোগী গোবিন্দপাদ সমাধিস্থ অবস্থায় আছেন। সাধনার দ্বারা যাদের সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি খুলেছে, যারা আত্মজ্ঞান লাভ করেছে তারাই তাঁর কৃপালাভ করে। দীর্ঘকাল ধরে আমরা এখানে সাধনা করে চলেছি তাঁর কৃপালাভের আশায়। কিন্তু আজও তাঁর কৃপালাভ করতে পারিনি। কবে যে এই মহাযোগী সমাধি হতে জাগবেন তা কেউ জানে না। তোমার যা কিছু জানাবার এখান থেকেই জানাও।
শঙ্কর তেমনি কাতরভাবে বললেন, প্রভু, আমি যে যোগীরাজ গোবিন্দপাদ দর্শন করার অভিলাষেই এসেছি। তাঁর আশ্রয় না পাওয়া পর্যন্ত শান্তি পাব না আমি। সাধক বললেন, বৎস, বুঝেছি তুমি মহাভাগ্যবান। তাই এই বয়সেই তোমার মধ্যে জেগেছে এই আধ্যাত্মিক আর্তি। তুমি শক্তিধর। এই পাথরটি সরিয়ে গুহাদ্বার মুক্ত করে তোমার প্রার্থনা জানাও। অর্জিত তেজ ও আত্মপ্রত্যয়ে উদ্দীপিত হয়ে শঙ্কর হাত দিয়ে পাথরটি সরাবার চেষ্টা করতে লাগলেন। এদিকে তখন অন্যান্য সাধকদের ধ্যান ভেঙ্গে গেছে। তাঁরাও সবাই এসে পাথরটিতে হাত দিলেন। তখন সকলের সম্মিলিত চেষ্টায় পাথর সরে গেল। গুহাদ্বার উন্মুক্ত হলো।
প্রদীপের আলোয় দেখা গেল, মহাযোগীর চক্ষুদুটি ধ্যাননিমীলিত রয়েছে তখনো। এই অলৌকিক জ্যোতির আভায় উজ্জ্বল দেখাচ্ছে তাঁর তপোসিদ্ধ দেহখানি। সে দেহে প্রাণের স্পন্দন না থাকলেও মৃত্যুকে অতিক্রম করে আত্মজ্ঞানের সুউচ্চ স্তরে উন্নীত হয়ে সমাসীন হয়ে আছেন হয়ে আছেন তিনি। বালক শঙ্কর তখন মহাযোগীর স্তব করতে লাগলেন একমনে। তাঁর স্তবগান শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলেন সাধকেরা। তাঁরা বুঝলেন, এ বালক নিশ্চয় দৈববলে বলীয়ান, তা না হলে সমাধিস্থ গোবিন্দপাদের মত মহাযোগীর সামনে দাঁড়িয়ে এমন নির্ভীকভাবে স্তবগান করতে সাহস করত না। অথবা এ হয়ত যোগীরাজের লীলা, তাই তিনি হয়ত তাঁর চিহ্নিত শিষ্যকে আকর্ষণ করে এনেছেন তাঁর কাছে। যোগীরাজ বালক শঙ্করের স্তবে তুষ্ট হয়ে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন। মুমুক্ষূ বালককে অভয় ও আশ্রয় দিলেন তখনি।
গোবিন্দ শঙ্করের পরিচয় জানতে চাইলে, শঙ্কর মুখে মুখে একটি শ্লোক রচনা করেন। এই শ্লোকটিই অদ্বৈত বেদান্ত তত্ত্ব প্রকাশ করে। গোবিন্দ তা শুনে খুব খুশি হন এবং শঙ্করকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। শ্রীগুরু গোবিন্দপাদ্ সম্প্রদায়ানুসারে 'তত্ত্বমস্যাদি' বাক্য দ্বারা শাশ্বত অদ্বৈত ব্ৰহ্মতত্ত্ব উপদেশ করলেন, ব্যাসদেব যা আপন পুত্ৰ শুকদেবকে করেছিলেন। শুকদেব হতে গৌড়পাদ, গৌড়পাদ হতে গোবিন্দপাদ লাভ করেছিলেন। গোবিন্দপাদ্ হতে শঙ্কর প্রাপ্ত হলেন।
গুরু গোবিন্দভগবৎ পাদ্ শঙ্করকে প্রথমে হঠযোগের শিক্ষা দিলেন, শঙ্কর অতিঅল্প সময়েই তাতে অভ্যস্ত হতে লাগল। দ্বিতীয় বৎসরারম্ভে গোবিন্দ শঙ্করকে রাজযোগে দীক্ষিত করলেন। তাতেও শঙ্কর আশাতীত নিপূণতা প্রদর্শন করলেন। তৎপরে তৃতীয় বৎসরারম্ভে গোবিন্দপাদ্ শঙ্করকে ব্রহ্মসূত্রের ব্যাসশুক-সম্প্রদায়লব্ধ অর্থ ও পরমার্থ জ্ঞানযোগ উপদেশ করতে লাগলেন-শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসনের প্রকৃত রহস্য উপদেশ করতে লাগিলেন। শুতিধর মহাপন্ডিত শঙ্কর শুনিবামাত্র তা আয়ত্ত্ব করে ফেলতেন। ধীরে ধীরে গুরুকৃপায় শঙ্করের অপরোক্ষানুভবও হতে লাগল। তৃতীয় বৎসরান্তে গোবিন্দপাদ্ দেখলেন শঙ্করভগবদ্পাদের সাধনা শেষ হয়েছে। শঙ্করের মুখেশরীরে এক দিব্যানন্দ প্রস্ফুটিত হয়েছে। স্বয়ং শিব পরমহংসচৰ্য্যা অঙ্গীকার করে “ব্রহ্মৈবাস্মি” “ব্রহ্মই আমি” এই নিশ্চয় করত সর্বত্র অসঙ্গ হলেন। ব্রহ্মক্ষীর জগৎ নীর হংস বৃত্তিতে অনুভব করিয়া ঐগুরু চরণার্চনাতে নিরত এবং নর্মদা-নদী তটে অবস্থিত হলেন।
একবার বর্ষাকালে কয়েকদিন ধরে প্রবল বর্ষণ হওয়ার ফলে নর্মদা নদীতে বন্যা দেখা দেয়। নদীর জল ফুলে উঠতে থাকে প্রতি মুহূর্তে। নদীর জলস্রোত কূল ছাপিয়ে ওঙ্কারনাথ পাহাড়ের গায়ে ক্রমাগত ধাক্কা মারতে থাকে। এদিকে যোগীবর গোবিন্দপাদজী তখন তাঁর নিজস্ব গুহার মধ্যে সমাধিমগ্ন হয়েছিলেন। তাঁর কোন বাহ্যজ্ঞান ছিল না। বন্যার অবস্থা দেখে শঙ্কিত হয়ে পড়েন শিষ্যরা। বন্যার জল বাড়তে বাড়তে গুহার মুখের কাছে এসে পড়েছে। এরপর জলস্রোত গুহার ভিতরে ঢুকে সমাধিস্থ গুরুদেবের জীবন বিপন্ন করে তুলবে। বন্যার আগ্রাসী স্রোতের গতি রোধ যেমন সম্ভব নয় তেমনি সমাধিস্থ গুরুদেবের ধ্যান ভাঙ্গিয়ে তাঁকে পাহাড়ের ঊর্ধ্বতন কোন স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়।
এই সব দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন শিষ্যরা। আচার্য শঙ্কর সব কিছু লক্ষ্য করে শেষে এগিয়ে এসে বললেন, আপনারা উদ্বিগ্ন হবেন না। আমাদের গুরু মহারাজ ব্রহ্মজ্ঞ মহাপুরুষ। তার উপর তিনি এখন সমাধিমগ্ন। এ অবস্থায় কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় তাঁর কোন অনিষ্ট সাধন করতে পারবে না। মহাযোগীর সঙ্গে প্রকৃতি সহযোগিতা করতে বাধ্য। তাছাড়া তাঁর আশীর্বাদে এ বন্যার গতিরোধ আমিই করতে পারব।
এই বলে একটি মাটির বড় কলসী এনে কাত করে গুহার মুখের কাছে রেখে দিলেন তিনি। এরপর দেখা গেল বন্যার ঢেউগুলি প্রবল উচ্ছ্বাসে গুহাদ্বারে এগিয়ে আসতে সেই কলসীর মুখে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে কোথায়। স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে ঢেউগুলির সব উচ্ছ্বাস। দেখতে দেখতে বন্যার সব জলোচ্ছ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। জলের বিপদ সীমানা থেকে আশ্চর্যভাবে রক্ষা পেয়ে গেল সেই সাধনগুহাটি। এ ব্যাপারে কিশোর শঙ্করের যোগশক্তির পরিচয় পেয়ে তাঁকে সাধুবাদ দিতে লাগলেন শিষ্যরা।
গুরু গোবিন্দপাদের সমাধিভঙ্গ হবার পর সব কিছু শুনে প্রসন্ন হয়ে তিনি শঙ্করকে বললেন, আমার আশীর্বাদ তুমি লাভ করেছ। আমার আশীর্বাদে তুমি আত্মকাম হয়ে উঠেছ। সর্বশাস্ত্রের তত্ত্ব ও সর্বজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে যোগ বিভূতি করতলগত হয়েছে তোমার। আর কিছু প্রার্থনা থাকে তো বল। গুরুদেবকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে করযোড়ে শঙ্কর বললেন, প্রভু, আপনার কৃপায় আমার সকল অভাব দূর হয়েছে। আমার প্রার্থনার আর কিছুই নেই। আপনি কৃপা করে আমায় অনুমতি দিলে এবার সমাধিস্থ হয়ে এই মরদেহ ত্যাগ করে ব্রহ্মের মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দিতে চাই।
গোবিন্দপাদ কিছুক্ষন গম্ভীর হয়ে চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, বৎস, দেহত্যাগের সময় তোমার এখনো আসেনি। যে যুগ-প্রয়োজনে তুমি এসেছ সে কাজ তোমার এখনো শেষ হয়নি। অদ্বৈত ব্রহ্মের জ্ঞান নতুন করে প্রচার করতে হবে তোমায়। লুপ্ত তীর্থগুলি উদ্ধার করতে হবে। সাধু সন্ন্যাসীদের মধ্যে যে পাপ ও অনাচার ঢুকেছে তার সংস্কার সাধন করে এদেশের অধ্যাত্ম জীবনকে পুনর্গঠিত করে তুলতে হবে। দেশের ঈশ্বরবিমুখ জনসমাজকে ঈশ্বরমুখী করে কল্যাণের দিকে নিয়ে যেতে হবে তোমাকে। শঙ্কর তেমনি করযোড়ে বললেন, আদেশ করুন কি করতে হবে আমায়?
গোবিন্দপাদ্ শঙ্করের সিদ্ধি দেখে শঙ্করকে বললেন-'শঙ্কর! তুমি বৈদিক ধর্ম রক্ষার্থে ভগবানের শিবের কৃপায় ধরাধামে জন্মেছ। তোমার এই আগমনবার্তা আমি আমার গুরু গৌড়পাদের থেকে শ্রবণ করেছি। তোমাকে সম্প্রদায়ক্রমে রক্ষিত অদ্বৈতব্রহ্মজ্ঞান দিবার জন্যই আমি এযাবৎকাল জীবিত ছিলাম। এখন আমার কার্য্য শেষ, মহাসমাধির সময় হয়েছে। তুমি এক্ষণে কাশীধাম যাও এবং বাদরায়ণের ব্রহ্মসূত্রের একটি ভাষ্য লিখে অদ্বৈত বেদান্ত প্রচার কর। সেখানে সদাশিব তোমাকে সাক্ষাৎ দর্শন দিবেন।'
এইবলে তাকে বিদায় করলেন। শঙ্করও গুরুর চরণ বন্দনা করে বারাণসী যাত্রা করলেন, এবং অচিরে গঙ্গালঙ্কৃতা-কাশী প্রাপ্ত হয়ে প্রণাম ও ভাগীরথী-প্রবাহে অবগাহন করলেন। পরে যথাবিধি বিশ্বেশ্বরের পূজা করে সেই মোক্ষ-প্রদ-ক্ষেত্রে সুর-তরঙ্গিন তটে অবস্থিত হলেন। শঙ্কর, বিমল-সুখ-জননী শম্ভুপুরী কাশীতে জাহ্নবী-সলিলে মজ্জন করে, বেদান্ত বাক্যে আত্মতত্ত্ব বিচার করত অচল পদে সন্নিবিষ্ট হলেন।