১০৮ শ্রীমৎ স্বামী রামদাসজী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজ
অমৃতসরের নিকটবর্তী স্থান লোনাচামারী গ্রামে এক বিশিষ্ট ও সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ বংশে জন্মহয় ত্রিকালজয়ী সাধকের যিনি ভাবি কালের ১০৮ শ্রীমৎ স্বামী রামদাসজী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজ নামে পরিচিত হউন। পূর্বাশ্রমের নাম “জয়রাম”।
১০৮ শ্রীমৎ স্বামী রামদাসজী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজের দেহ এতটাই প্রাচীন ছিলেন যে ব্রজভূমিতে উনি যখন অবস্থান করা শুরু করেন, এবং তদপরবর্তী যুগে ওনার বাঙালী ব্রাহ্মণ দেহধারী শিষ্য শ্রীমৎ তারাকিশোর শর্ম্মা চৌধুরী জী যিনি ভাবিকালের স্বামী সন্তদাসজী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজ রূপে পরিচিত হউন তিনি যখন তার শ্রীগুরুদেবের জীবনী বৃত্তান্ত লেখার সময় যে জন্ম-সময় ব্যক্ত করেন তা একান্ত অনুমেয়, এবং আনুমানিক সাল ও বৎসর অনুধাবন করা কঠিন। এই কথা বলা হলো কিন্তু কেন ? কোনো কোনো মতে বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথি “বুদ্ধ পূর্ণিমায়" তার আবির্ভাব তিথি পালন করা হলেও এটিই প্রমাণিত হয় তিনি স্বয়ম্ভু নরাকার (নরের আকারে) ঈশ্বর।
ভূমণ্ডলে সম্পূর্ণ রূপে চতুর্দ্দশ ভুবনের উল্লেখ আছে অর্থাৎ উর্দ্ধ সপ্ত লোক ও নিম্ন সপ্ত পাতাল। গায়ত্রী মন্ত্রের রহস্যের মধ্যে উর্দ্ধ সপ্ত লোকের বিবরণ সম্পুটিত। স্বামী রামদাসজী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজ এই উর্দ্ধ সপ্ত লোকের মধ্যে কোন স্তরে অবস্থান করতেন সেটি যোগীদের অগম্য বিষয়। তাই তো বলি যিনি “গোপীজন বল্লভ ” তিনি “যোগীগণের দুর্লভ ”।
তার জীবনী মাধ্যমে যতটুকু জানা যায় বাল্যকাল হতে বালক জয়রামের গুরুকূলে বা গুরু গৃহে শাস্ত্র অধ্যায়নে মনোনিবেশ করেন এবং তদুপরি তার সংস্কার অনুযায়ী বাল্যকালে এক রামানন্দ সম্প্রদায়ের সাধুর নিকট যে রামনাম মন্ত্র পেয়েছিলেন এবং বংশজাত ব্রাহ্মণ সূত্রে উপনয়ন সংস্কারের ফলে গুরুকূলেই পাঠ শেষে তিনি সেই সকল মন্ত্র জপ ও অনুধ্যান করতেন। গুরুকূলের পাঠ শেষে বাড়ী ফিরলে তার পরিণত বয়সে উপনীত হউন। জয়রামের পিতা জয়রামের বিবাহের ব্যবস্থা করলে জয়রাম স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তিনি বিবাহ করতে নারাজ, তার অন্যসকল ভাইদের বিবাহ দিন। এই কথা বলার সাথে সাথেই জয়রামের মনের মধ্যে গায়ত্রী সাধনায় সিদ্ধিলাভ করার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে যায়, এবং শাস্ত্র মতে তিনি গায়ত্রী জপ রহস্য উদ্ধার ও গায়ত্রী শাপমোচন বিষয় অনুধাবন করার জন্য তার গ্রামের'ই কিছু দূরে এক গাছতলায় আসন স্থাপন করে বসে তিনি গায়ত্রী সাধনায় ব্রতী হউন, ফলে বেদ মাতা গায়ত্রী সন্তুষ্ট হলে তাকে নির্দেশ দেন - “ তুমি জ্বালামুখী পর্বতের উদ্দেশ্য রওনা দাও, সেখানেই তোমার অবশিষ্ট ২৫'হাজার জপ সমাপন হবে।"
এই আদেশ পাওয়া মাত্র তিনি তার সমবয়সী এক ভাইপো কে নিয়ে জ্বালামুখী পর্বতের উদ্দেশ্যে রওনা হউন। পথেই এক সুপ্রাচীন জটাজুট মন্ডিত সাধুর দর্শনে স্তব্ধ হউন তিনি, এবং অনুভব করেন ইনি যেন জয়রাম কে আকর্ষণ করছেন। পরবর্তী কালে তার চরণ প্রান্তে গিয়ে তার পরিচয় জানায় তিনি বলেন তিনি নিম্বার্ক সম্প্রদায় ভুক্ত স্বভূরাম দ্বারার নাগাজী মহারাজের পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ১০৮ শ্রীমৎ স্বামী দেবদাসজী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজ।
স্বামী দেবদাসজী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজ কে দর্শন মাত্রেই জয়রামের সংসারের প্রতি আশা চাহিদা সব যেন পুড়ে গেলো, তিনি কিঞ্চিৎ বিলম্ব না করিয়া সদগুরুর চরণে আশ্রয় লাভ পূর্ব্বক দিক্ষা ও ক্রমে সন্ন্যাস নেন, এবং তার নাম হয় ১০৮ শ্রীমৎ স্বামী রামদাসজী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজ।
কাকা জয়রামের এহেন সন্ন্যাস নেওয়া ঠিক না বুঝে ভাইপো দৌড় দিলো নিজ গৃহ উদ্দেশ্যে। জয়রামের পিতা কে এই সংবাদ দেওয়ায় পিতা সহসা জয়রাম ও তার গুরুদেবের নিকট উপস্থিত হয়েও জানান “তুমি যদি আমার সাথে এক্ষুণি বাড়ী না চলো, তাহলে আমি সরকারের নিকট তোমার নামে নালিশ জানাবো" এই কথা শুনে সদ্য সন্ন্যাস প্রাপ্ত জয়রাম জানান “ পিতা! আপনি যদি এহেন বাক্য প্রয়োগ করেন আমার গুরুদেব নামে তাহলে আমি হাজিরা দিয়ে বলবো আমি স্বেচ্ছায় সংসার ছেড়েছি ও সন্ন্যাস নিয়েছি ” এই কথা শুনে জয়রামের পিতা নিরুপায় হয়ে তার গুরুদেবের নিকট কাঁদতে কাঁদতে অনুনয় করেন তার ছেলে কে যেন একবার তার সাথে বাড়ী যেতে দেন, পরিণামে সদগুরু স্বামী দেবদাসজী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজ জী আদেশ দেন “ বিরক্ত ত্যাগী সন্ন্যাসী কে একবার হলেও তার জন্মস্থান দর্শনে যাওয়া উচিৎ"।
শ্রীগুরুর নিকট আদেশ পেয়ে স্বামী রামদাসজী তার পূর্বাশ্রমের পিতার সহিত তার পূর্বাশ্রমের উদ্দেশ্যে রওনা হউন।
জন্মস্থানে গেলেও রামদাসজী আর বাড়ীতে ঢুকলেন না। সাধুর স্বভাবতই কর্তব্য ভাবে গাছতলায় বাসই উপযুক্ত। তাই তিনি পূর্বোক্ত বটগাছটির (যেখানে তিনি পূর্বে গায়ত্রী জপ করেছিলেন) তলায় আসন স্থাপন করলেন। তাঁর মা অন্য সন্তানদের চেয়ে তাঁকে বেশী ভালবাসতেন। তিনি এসে কাঁদতে লাগলেন। তখন স্বামী রামদাসজী তার জননী কে বললেন “মা আমি সন্ন্যাসী। সেটি মঙ্গলেরই বিষয়। তাই তোমার এমন
করে উদাস বা কান্নাকাটি করা উচিত নয়। যদি তুমি এত কাঁদ তবে আমি আর এখানে অবস্থান করতে পারবো না।”
একথায় তাঁর মা রাজি হলেন। গ্রামের এক এক বাড়ীতে এক এক দিন ভিক্ষান্ন গ্রহণ করতে তিনি রাজি হলেন, এবং সমভাবে তাঁর মায়ের বাড়িতেও একদিন ভিক্ষান্ন গ্রহণ করলেন। ঐ গাছতলায় আসন স্থাপন করে একদিন রাত্রে রামদাসজী সাধনায় বসে আছেন এমন সময় আকাশ গগণ ভেদ করে গায়ত্রী মা তাঁর সামনে আবির্ভূতা হয়ে বললেন– “বৎস। আমি তোমার সাধনায় সিদ্ধ হয়েছি। আর বেশী জপ তোমায় করতে হবে না। আমি প্রসন্ন হয়েছি। তুমি বর প্রার্থনা কর।” তখন রামদাসজী গায়ত্রী দেবীকে প্রণাম করে বললেন “মা! আমি এখন সাধু হয়েছি, ও সংসার ত্যাগ করেছি। আমার কোন বাসনা নেই। এখন তাই কোন বর প্রার্থনা করার আমার প্রয়োজন নেই। তুমি আমার প্রতি প্রসন্ন থাক, এই বর চাই”। তখন গায়ত্রী দেবী রামদাসজীকে অভয়দান করে বললেন “এবমস্তু” বলে দেবী অন্তর্হিত হলেন।
তিনি 'কাঠিয়া বাবা' নামে পরিচিত ছিলেন, দস্যু দমনে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।
প্রধান তথ্য ও ঘটনাবলী:
জন্ম ও আদি জীবন: তিনি ১৮০০ সালের ২৪ জুলাই পাঞ্জাবের লোনাচামারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর শৈশব নাম ছিল দ্বারকা দাস ।
সাধনা ও সিদ্ধি: তিনি কঠোর তপস্যা করে সিদ্ধিলাভ করেন। শীতকালে বরফ পানিতে ডুব দিয়ে সারা রাত ধ্যান করার মত কঠিন সাধনা তিনি করেছেন । ভরতপুরের সাইলানি কুন্ডে তিনি ঈশ্বর উপলব্ধি বা সিদ্ধিলাভ করেন ।
কাঠিয়া বাবা নাম: তিনি তাঁর গুরুদেবের নির্দেশে একটি নির্দিষ্ট কাঠ (লাঠি) ব্যবহার করতেন, যার থেকে তাঁর নাম "কাঠিয়া বাবা" হয় ।
বৈশিষ্ট্য: তিনি একজন মহান যোগী ও বৈষ্ণব সাধক ছিলেন। অলৌকিক ক্ষমতা থাকলেও তিনি তা গোপন রাখতেন এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতেন ।
দস্যু দমন: তাঁর অলৌকিক ইচ্ছাশক্তির দ্বারা গোসাইয়ান নামক এক ভয়াবহ দস্যুকে সাধুতে রূপান্তর করেছিলেন ।
সম্প্রদায়: তিনি নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের ৫৪তম আচার্য এবং চতুঃসম্প্রদায়ের ব্রজবিদেহী মহন্ত ছিলেন ।
তিরোধান: তিনি ১৯০৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বৃন্দাবনে দেহত্যাগ করেন ।
প্রভাব:
স্বামী রামদাস কাঠিয়া বাবাজী মহারাজ বৈষ্ণব সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে শ্রী সন্তদাস কাঠিয়া বাবাজী মহারাজ অন্যতম, যিনি বাংলায় নিম্বার্ক দর্শন প্রচারে ভূমিকা রেখেছিলেন ।