"মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র"
মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র হল ভগবান শিবকে উৎসর্গীকৃত একটি শক্তিশালী বৈদিক মন্ত্র, যা 'ত্র্যম্বকম মন্ত্র' নামেও পরিচিত, যার মূলমন্ত্র হল ওঁ ত্র্যম্বকম যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্। উর্বারুকমিব বন্ধনান্ মৃত্যোর্মুক্ষীয় মামৃতাৎ।।।
এই মন্ত্রের অর্থ হলো, "হে তিন নয়ন বিশিষ্ট ভগবান শিব, আমরা আপনার পূজা করি, যিনি সুগন্ধি এবং পুষ্টি প্রদান করেন। তিনি আমাদের সমস্ত বন্ধন (জাগতিক আসক্তি ও মৃত্যু) থেকে মুক্ত করে অমৃতত্বের দিকে নিয়ে যান"।
এটি স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, সমৃদ্ধি ও মোক্ষ লাভের জন্য জপ করা হয় এবং ঋগ্বেদ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র পাঠের উপকারিতা :------------
১. নিয়মিত মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করলে মনের সব রকম ভয় ধীরে ধীরে দূর হয়। সাহস ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
২. বিশ্বাস করা হয়, ভক্তি ও নিয়ম মেনে এই মন্ত্র পাঠ করলে অকালমৃত্যু ও বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে মহাদেব রক্ষা করেন।
৩. যাঁদের কালসর্প দোষ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই মন্ত্র জপ করলে তার কুপ্রভাব অনেকটাই কমে আসে।
৪. মন দিয়ে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করলে একাগ্রতা বাড়ে। পড়াশোনা, কাজকর্ম ও জীবনের নানা ক্ষেত্রে উন্নতি দেখা যায়।
৫. এই মন্ত্র জপ শরীর ও মনের ওপরও ভালো প্রভাব ফেলে। অনেক সময় রোগব্যাধি ও মানসিক অশান্তি থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়।
এবার জেনেনি এই মন্ত্র কিভাবে পাঠ করতে হয়?
মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র পাঠ করার কিছু নিয়ম আছে। এই নিয়মগুলো মন দিয়ে মেনে জপ করলে ভালো ফল পাওয়া যায় এবং মনের ইচ্ছাও পূরণ হতে পারে। তাই নিয়মগুলো জেনে নেওয়া খুব জরুরি।
১. সূর্য ওঠার আগে, অর্থাৎ ভোরবেলা (ব্রাহ্ম মুহূর্তে) এই মন্ত্র জপ করা সবচেয়ে ভালো। আপনি চাইলে দিনের অন্য সময়ও পাঠ করতে।
২. মন্ত্র জপের আগে স্নান করতে হবে। তারপর পরিষ্কার ও সাদা বা হালকা রঙের কাপড় পরতে হবে।
৩. মন্ত্র জপ করার সময় মেঝেতে কুশের আসন বা পরিষ্কার কাপড় পেতে তার ওপর বসতে হবে। বসার সময় পা মুড়ে পদ্মাসনে বসাই সবচেয়ে উত্তম।
৪. আপনার সামনে একটি শিবমূর্তি বা শিবলিঙ্গ রাখুন। তার সামনে একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে মহাদেবের পাশে রাখুন।
৫. হাতে একটি রুদ্রাক্ষের মালা নিন। মালা হাতে নিয়ে শান্ত মনে ১০৮ বার মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করুন। জপ করার সময় মন যেন অন্যদিকে না যায়, শুধু মহাদেবকে স্মরণ করে এক মনে মন্ত্র জপ করুন।
৬. মন্ত্র জপ চলাকালীন উঠে যাওয়া যাবে না। মাঝখানে কথা বলা বা কাউকে সাড়া দেওয়াও ঠিক নয়।
৭. মন্ত্র পাঠ শেষ হলে দেবাদিদেব মহাদেবকে প্রণাম করুন। এরপর মনে মনে নিজের সব ইচ্ছা ও কষ্ট তাঁর কাছে জানান। তারপর ব্যবহৃত সব জিনিস পরিষ্কার করে পবিত্র জায়গায় রেখে দিন।
মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র হল একটি শক্তিশালী বৈদিক মন্ত্র যা রূপান্তরের প্রভু শিবকে
উৎসর্গ করা হয়েছে, যিনি মোক্ষ (মৃত্যু ও পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তি) প্রদান করেন ।
মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র একটি সর্বরোগ-বিপদ হরণকারী মন্ত্র
এই মন্ত্রটি ভগবান মহাদেবকে স্মরণ করে রচিত, এই মন্ত্রটি ঋগ্বেদেও দৃষ্ট হয় - আবার এই
মন্ত্রটি মার্কণ্ডেয় পুরাণেও দৃষ্ট হয়, এই মন্ত্রটি জপ করলে মানুষ সব অশান্তি , রোগপীড়া ,
ব্যাধি থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত হয় । নিরাকার মহাদেবই মৃত্যুমুখী প্রাণকে বলপূর্বক জীবদেহে পুণঃ
প্রতিষ্ঠিত করেন এবং অপার শান্তিদান করেন । এই মন্ত্রটির সাথে একটি কাহিণী প্রচলিত আছে ।
সেটি হল - মহর্ষি মৃকন্ডু এবং তাঁর পত্নী মরুদবতী পুত্রহীণ ছিলেন ।
তারা তপস্যা করেন মহাদেবকে সন্তুষ্ট করেন এবং এক পুত্র লাভ করেন , যার নাম হল মার্কন্ডেয় ।
কিন্তু মার্কন্ডেয়র বাল্যকালেই মৃত্যুযোগ ছিল । অভিজ্ঞ ঋষিদের কথায় বালক মার্কন্ডেয় শিব লিঙ্গের
সামনে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করতে লাগলেন । যথা সময়ে যম রাজ এলেন ।
কিন্তু মহাদেবের শরণে আসা প্রাণকে কেইবা হরণ করতে পারে !
যমরাজ পরাজিত হয়ে ফিরে গেলেন এবং মার্কন্ডেয় মহাদেবের বরে চিরায়ু লাভ করলেন ।
পরে তিনি মার্কন্ডেয় পুরাণ রচনা করলেন
মার্কন্ডেয় ঋষি মহাদেবের স্তুতি করলেন মহামৃত্যুঞ্জয় স্তোত্রের মাধ্যমে যেটি মার্কন্ডেয় পুরাণে পাওয়া যায় ।
আপনি যদি মহাদেবের বিশেষ আশীর্বাদ পেতে চান তবে মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করুন।
শিবপুরাণ এবং আরও অনেক গ্রন্থে মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের কথা উল্লেখ আছে। মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র
আসলে ভগবান শিবের মন্ত্র। বিশ্বাস করা হয় যে, মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করলে ভগবান শিব সন্তুষ্ট হন।
ঋকবেদে উল্লেখ পাওয়া যায় এই মন্ত্র জপ করে অকাল-মৃত্যুকেও জিতে নেওয়া সম্ভব!
যদি সঠিক নিয়ম মেনে এই মন্ত্রটি জপ করা যায়, তাহলে দেহের দৈবিক শক্তি এতটাই
বেড়ে যায় যে অকাল-মৃত্যু ধারে কাছেও ঘেঁষতে ভয় পায়!
মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র এবং এর অর্থ:------
দেবনাগরী লিপি-তে:
ॐ त्र्य॑म्बकं यजामहे सु॒गन्धिं॑ पुष्टि॒वर्ध॑नम् ।
उ॒र्वा॒रु॒कमि॑व॒ बन्ध॑नान् मृ॒त्योर्मुक्षीय॒ मा ऽमृता॑त् ।।
বাংলায়:
‘ওঁ ত্রম্বকম যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টি বর্ধনম।।
ঊর্বারু কমিব বন্ধনাৎ মৃত্যুমক্ষীয় মামৃতাৎ ‘ওঁ'।।
এই মন্ত্রটির অর্থ হল, আমরা ভগবান শিবের উপাসনা করি, যাঁর ত্রিনেত্র রয়েছে, যিনি প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে শক্তির সঞ্চার করে এবং সমগ্র সৃষ্টিকে লালন-পালন করেন। এই মন্ত্রটি আমাদের শক্তি যোগায় এবং জীবনে সুখ, আনন্দ ও শান্তির অনুভূতি প্রদান করে। আমরা প্রত্যেকেই জানি যে অমরত্ব অর্জন করা সম্ভব নয়, তবে ভোলানাথ তাঁর শক্তি দিয়ে আমাদের মৃত্যুর সময়কে কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দিতে পারেন।
মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করার উপযুক্ত সময়:-
শাস্ত্রে, মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করার জন্য রাত 2টো থেকে 4টে পর্যন্ত সময় সবচেয়ে
সেরা বলে বিবেচিত হয়। স্নান করে পরিষ্কার বস্ত্র পরুন এবং রুদ্রাক্ষের জপমালা দিয়ে
এই মন্ত্রটি 108 জপ করুন।
মন্ত্রটি জপ করার নিয়ম:-
এবার জেনে নিন এই মন্ত্র জপ করার আগে কী কী বিষয়ে খেয়াল রাখবেন—
পবিত্র মনে এই মন্ত্র পাঠ করুন। এই জপ করতে হবে রুদ্রাক্ষের মালার সাহায্যে।
ধূপ বা প্রদীপ সহযোগে এই মন্ত্র জপ করুন।
ভগবান শিবের ছবি বা মূর্তি কিংবা মহামৃত্যুঞ্জয় যজ্ঞের মাধ্যম এই মন্ত্র জপ করা যায়।
কুশের আসনে বসে জপ করুন।
প্রথম ধাপে মন্ত্রটি ঠিক মতো উচ্চারণ করার চেষ্টা করুন। খেয়াল রাখুন যাতে কোনও
ভাবেই ভুল উচ্চারণ না করে ফেলেন। এরপর শান্তভাবে আসনে বসে এক মনে
মন্ত্রটি জপ করা শুরু করুন। মন্ত্রটি পাঠ করার সময় দুই চোখের মাঝখানে
মনোনিবেশ করার চেষ্টা করবেন। এমনটা করলে দেখবেন সহজে একাগ্রতা ফিরে আসবে।
প্রসঙ্গত, প্রথম প্রথম এক মনে মন্ত্রটি পাঠ করতে হয়তো অসুবিধা হতে পারে।
তাই ধীরে ধীরে যপের সময় বাড়াবেন। এক সময় গিয়ে দেখবেন খুব সহজেই
108 বার মন্ত্রটি পাঠ করতে পারছেন।
মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপের উপকারিতা
প্রসঙ্গত, চার লাইনে ভাঙা এই মন্ত্রটির প্রতিটি লাইনে আটটা চিহ্ন রয়েছে,
যা উচ্চারণ করার সময় সারা শরীরজুড়ে একটা কম্পন ছড়িয়ে পরে।
এই কম্পনই শরীরে ভেতরে থাকা হাজারো ক্ষতকে নিমেষে সারিয়ে তোলে।
শুধু তাই নয়, ব্রেন পাওয়ার বৃদ্ধিতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে এই মন্ত্রটি।
আধুনিক কালে এই মন্ত্রটিকে নিয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে
মন্ত্রটি পাঠ করার সময় মস্তিষ্কের অন্দরে থাকা নিউরনগুলি এতটাই অ্যাক্টিভ
হয়ে যায় যে ধীরে ধীরে মনোযোগ বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। সেই সঙ্গে বুদ্ধি
এবং স্মৃতিশক্তিরও উন্নতি ঘটে। মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র ভগবান শিবকে সন্তুষ্ট করার সেরা উপায়।
শাস্ত্র অনুসারে, এই মহামন্ত্র থেকে মৃত্যুকেও জয় করা যায়! মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করলে
যেকোনও রোগ বা নেতিবাচক প্রভাবগুলি দূর করা যায়। মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র কঠিন রোগ
এবং অকাল মৃত্যু থেকে মানুষকে রক্ষা করে। কোষ্ঠীতে কোনও দোষ, পারিবারিক
কলহ, ধন-সম্পত্তি সম্পর্কিত যেকোনও সমস্যার ক্ষেত্রেও এই মন্ত্র উপকারি।
সাধনাতে মহা আত্মশক্তির প্রকাশ হয় এই মন্ত্র জপ করলে।
কুণ্ডলিনী শক্তির জাগরণ ঘটে এই মন্ত্র জপ এর প্রভাবে।
এই মন্ত্রের জপ করলে সমস্ত গ্রহের প্রকোপ থেকে রেহাই মেলে।
পরিবারে কেউ অসুস্থ থাকলে তাঁর স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে।
আশু সঙ্কট থেকে বাঁচতেও এই মন্ত্র খুবই কার্যকরী।
কুন্ডলীগত বহু দোষ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় নিয়মিত এই মন্ত্র জপ করলে।
মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র একটি সর্বরোগ-বিপদ হরণকারী মন্ত্র
শুধু তাই নয়, যে কোনও ধরনের ভয় দূর করে মনকে শক্তিশালী করে তুলতেও
এই মন্ত্রের কোনও বিকল্প হয় না বললেই চলে।
পরিবারে সুখ-শান্তির ছোঁয়া লাগে:
মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র নিয়মিত যপ করলে জীবনে সুখ-সমৃদ্ধির সন্ধান পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে ভাগ্যও ফেরে। তাই দুর্ভাগ্যের কারণে যাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে তারা নিয়মিত এই মহা মন্ত্রের পাঠ শুরু করতে পারেন। এমনটা বিশ্বাস করা হয় যে প্রতিদিন যদি এক মনে 108 বার এই মন্ত্রটি যপ করা যায়, তাহলে জীবনে কোনও দিন কষ্টের সম্মুখিন হতে হয় না।
খারাপ শক্তি ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারে না:
শাস্ত্র মতে এই শক্তিশালী মন্ত্রটি প্রতিদিন 108 বার পাঠ করলে চারিপাশে শুভশক্তির
প্রভাব এতটা বেড়ে যায় যে নেগেটিভ এনার্জি ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারে না।
ফলে কোনও ধরনের বিপদ ঘটার আশঙ্কা একেবারে কমে যায়।
সেই সঙ্গে কালো যাদুর প্রভাবও নিমেষে কেটে যায়। তাই তো বলি বন্ধু,
সুখ-শান্তিতে এবং নিরাপদে যদি জীবন অতিবাহিত করতে হয়,
তাহলে নিয়মিত এই শিব মন্ত্রটি জপ করতে ভুলবেন না যেন!
গৃহস্তের পরিবেশ শুদ্ধ হয়ে ওঠে:
এমনটা বিশ্বাস করা হয় যে মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করা শুরু করলে বাড়ির প্রতিটি
কোনায় পজেটিভ শক্তির মাত্রা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ফলে বাড়ির পরিবেশে
পবিত্রতার ছোঁয়া লাগে। আর গৃহস্তের পরিবেশ যখন শুদ্ধ হয়ে ওঠে,
তখন সেখানে দেব-দেবীর আগমণ ঘটতে সময় লাগে না।
কোনও দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা কমে:
শিব পূরাণ অনুসারে মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র হল সেই মন্ত্র, যা যে কোনও ধরনের বিপদ
থেকে রক্ষা করে। শুধু তাই নয়, এই মন্ত্র বলে কোনও ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার
আশঙ্কাও যায় কমে। তাই যাদের জন্ম কুষ্টিতে দূর্ঘটনার যোগ রয়েছে,
তারা নিয়মিত এই মন্ত্রটি জপ করতে ভুলবেন না
